সমঝোতার পথে বাধা ইরানের ইউরেনিয়াম

May 24, 2026 - 20:00
0
সমঝোতার পথে বাধা ইরানের ইউরেনিয়াম

ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি নয় বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে, তখন তেহরানের এই অবস্থান নতুন করে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে।

রোববার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বিশেষ করে দেশের বাইরে ইউরেনিয়ামের মজুত পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইরান কোনোভাবেই সম্মত নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিষয়টি বর্তমান অস্থায়ী সমঝোতার অংশ নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে।

গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও উত্তেজনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার পর পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই সময় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক তেলের বাজারে, বাড়তে থাকে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষ “প্রায় চূড়ান্ত” সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি জানান, সম্ভাব্য এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে দেওয়া হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, সমঝোতার চূড়ান্ত কাঠামো ও বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

তবে ট্রাম্পের আশাবাদী বক্তব্যের পরও ইরানের অবস্থান স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তারা কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের চাপ তেহরান এখনো প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইউরেনিয়াম ইস্যুই বর্তমানে দুই দেশের আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতার রূপরেখায় যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং ধাপে ধাপে মার্কিন অবরোধ শিথিল করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এই ইস্যুতে আলাদা করে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই অনড় অবস্থান একদিকে যেমন তাদের কৌশলগত শক্তি প্রদর্শনের অংশ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। কারণ দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্র মনে করে, ইউরেনিয়ামের মজুত বিদেশে পাঠানো হলে ভবিষ্যতে তারা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে বিশ্ববাজারও এখন নজর রাখছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনার দিকে। কারণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তি ফিরতে পারে। আবার আলোচনায় ভাঙন ধরলে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধ এড়ানোর জন্য কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকলেও পারমাণবিক ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীর। আর সেই কারণেই সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হয় তার ওপর।

Comments (0)

User