যুদ্ধবিরতির মাঝেই দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলা

May 26, 2026 - 12:00
0

ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দক্ষিণ ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। শান্তি আলোচনা এগোনোর ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বাস্তবে দুই দেশের সামরিক অবস্থান যে এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল, সাম্প্রতিক এই হামলা তারই স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সমুদ্রপথে মাইন পুঁতে রাখার প্রস্তুতিতে থাকা স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ এবং মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, যুদ্ধবিরতির নীতি বজায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করছে। তবে একই সঙ্গে সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে সামরিক তৎপরতাও বন্ধ হয়নি। ফলে পুরো অঞ্চল এখনো অস্থিরতার ঝুঁকিতে রয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হামলাটি চালানো হয়েছে হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর বন্দর আব্বাসের কাছে। শহরটি ইরানের অন্যতম প্রধান নৌঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, বন্দর আব্বাস এলাকায় কয়েকটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার তদন্ত করছে বলে জানানো হলেও ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।

এই নীরবতাকেও কৌশলগত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। কারণ বর্তমানে তেহরান একদিকে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার পথও পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না।

ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই সম্প্রতি শান্তি আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির কথা জানিয়েছিলেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন যে, দ্রুত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও গত সপ্তাহে দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে দীর্ঘ উত্তেজনার অবসান ঘটতে পারে। কিন্তু পরে ট্রাম্প নিজেই আলোচনায় তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান সম্পর্ক এখন দ্বিমুখী অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উভয় দেশই সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করতেও রাজি নয়। ফলে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সীমিত সামরিক হামলা বা চাপ প্রয়োগের ঘটনা চলতেই পারে।

বিশ্ববাজারও এই পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়। সেখানে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে আবারও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এই হামলা কি শান্তি আলোচনাকে পুরোপুরি ভেঙে দেবে, নাকি এটি হবে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আরেকটি কৌশল? আপাতত তার উত্তর স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

Comments (0)

User