জাতিসংঘের কালো তালিকায় ইসরায়েল

May 29, 2026 - 12:00
0
জাতিসংঘের কালো তালিকায় ইসরায়েল

সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের একটি আসন্ন প্রতিবেদনে দেশটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেল আবিব। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিবের কার্যালয়ের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি।

ইসরায়েলের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বর্তমান মহাসচিবের সঙ্গে আর কোনো ধরনের সহযোগিতা করবে না ইসরায়েল। তাঁর অভিযোগ, যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যৌন সহিংসতার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রতি বছর জাতিসংঘ সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতা নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতি, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ বিশ্লেষণ করা হয়। গত বছরের আগস্টেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে, ফিলিস্তিনের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের ভিত্তিতে ইসরায়েলকে অভিযুক্ত পক্ষের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশটিকে হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে একই তালিকায় রাখা অন্যায়। তাদের বক্তব্য, অভিযোগগুলো যাচাইয়ের জন্য জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের ইসরায়েল সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।

তবে জাতিসংঘের অবস্থান ভিন্ন। সংস্থাটির বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকারভিত্তিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর আটক ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং যৌন সহিংসতার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর যৌন সহিংসতার ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য’ রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বড় কাঠামোগত সংকটের অংশ। অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠছে। অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতার কারণে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী নৌবহরের বিদেশি কর্মীদের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক করার পর ইসরায়েলি হেফাজতে তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং অন্তত ১৫টি যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি।

এই পুরো ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের একটি অংশ এখনো ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ ক্রমশ কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ফলে গাজা যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এটি এখন কূটনৈতিক, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ইসরায়েলের জন্য শুধু প্রতীকী ধাক্কা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার ইস্যু আরও বড় হয়ে সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর থেকেই জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে অবনতি হয়েছে। ইসরায়েল বহুবার জাতিসংঘকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করেছে। ২০২৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ‘অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি’ ঘোষণা করাও সেই উত্তেজনারই অংশ ছিল।

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এর গভীর প্রভাব পড়ছে।

Comments (0)

User