ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২ আকাশযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। কংগ্রেসের জন্য প্রস্তুত করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপারেশন এপিক ফিউরি চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪২টি সামরিক আকাশযান হারিয়েছে বা ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, নজরদারি আকাশযান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, উদ্ধার হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন আকাশযান।
২০ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষতির তালিকা এখনো চূড়ান্ত নাও হতে পারে। কারণ কিছু তথ্য এখনো গোপনীয়তার আওতায় রয়েছে, কিছু ক্ষতির দায় এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কিছু অংশ তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ফলে সামনে আরও নতুন তথ্য বেরিয়ে এলে ক্ষতির সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই হিসাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, আকাশপথে আধিপত্য ধরে রেখে ইরানের সামরিক অবকাঠামো দ্রুত দুর্বল করা যাবে। কিন্তু এখন যে ক্ষতির হিসাব সামনে এসেছে, তা দেখাচ্ছে যুদ্ধটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠেছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বা হারানো আকাশযানের মধ্যে ছিল ৪টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, ১টি এফ-৩৫এ লাইটনিং টু স্টেলথ যুদ্ধবিমান, ১টি এ-১০ থান্ডারবোল্ট টু আক্রমণ বিমান, ৭টি কে-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, ১টি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান, ২টি এমসি-১৩০জে কমান্ডো টু বিশেষ অভিযান বিমান, ১টি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন টু উদ্ধার হেলিকপ্টার, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার চালকবিহীন আকাশযান এবং ১টি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন উচ্চ উচ্চতার নজরদারি আকাশযান।
এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের ক্ষতির দাবি। এফ-৩৫ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত ও ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এটি কেবল একটি সামরিক সরঞ্জাম নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক আকাশশক্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। তাই এই যুদ্ধবিমান সত্যিই হারানো হয়ে থাকলে তা প্রতীকী ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই বড় ঘটনা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ১২ মে অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অর্থবিষয়ক কর্মকর্তা জুলস হার্স্ট তৃতীয় জানান, ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত বা প্রতিস্থাপনের নতুন হিসাব থেকে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিমানের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনর্গঠনের খরচও এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
সংঘাতের শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়, যার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির নামও প্রতিবেদনে এসেছে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের অন্যতম বড় সামরিক উত্তেজনার জন্ম দেয়।
তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই স্পষ্ট হতে থাকে যে আধুনিক যুদ্ধ শুধু উন্নত যুদ্ধবিমান বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে জেতা যায় না। ইরানের পাল্টা সক্ষমতা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন আকাশযান এবং বৈদ্যুতিন যুদ্ধকৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, নজরদারি বিমান এবং চালকবিহীন আকাশযানের ক্ষতি দেখিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু সম্মুখসারির যুদ্ধবিমান নয়, পেছনের সহায়ক ব্যবস্থাও এখন বড় আঘাতের মুখে পড়তে পারে। আধুনিক যুদ্ধে এই সহায়ক আকাশযানগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিমান অভিযান চালানো কঠিন হয়ে যায়।
ইরান দ্রুত এই প্রতিবেদনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবেদনটি তুলে ধরে দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, এই যুদ্ধ ইরানের জন্য কেবল প্রতিরোধের ঘটনা নয়, বরং ভবিষ্যৎ সামরিক প্রস্তুতির একটি শিক্ষা।
আরাঘচি আরও সতর্ক করে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি আবার সামরিক পদক্ষেপ শুরু করেন, তাহলে ইরান আরও বড় চমক দেখাতে পারে। এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো গভীর। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই প্রতিবেদন অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ ওয়াশিংটন এতদিন অপারেশন এপিক ফিউরিকে দ্রুত ও সফল অভিযান হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। কিন্তু ৪২টি আকাশযানের ক্ষতি এবং প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের হিসাব সেই দাবি প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হলেও তার মূল্য কতটা বেশি ছিল, সেটিই এখন বড় বিতর্ক।
এই পরিস্থিতি আরও একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে। সেটি হলো, আধুনিক যুদ্ধ আর একতরফা প্রযুক্তিগত আধিপত্যের জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশও যদি স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন আকাশযান ও সাইবার সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে, তাহলে শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রকেও বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
ইরান এই যুদ্ধকে নিজেদের পরাজয় হিসেবে নয়, বরং টিকে থাকার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এখন প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধের প্রকৃত খরচ আগে কতটা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল এবং জনগণ ও আইনপ্রণেতাদের সামনে পূর্ণ হিসাব তুলে ধরা হয়েছে কি না।
সব মিলিয়ে অপারেশন এপিক ফিউরি এখন শুধু একটি সামরিক অভিযানের নাম নয়। এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক যুদ্ধের ব্যয়, ঝুঁকি, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ৪২টি আকাশযানের ক্ষতি এবং প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় দেখিয়ে দিচ্ছে, আকাশে আধিপত্য থাকলেই যুদ্ধের ফল সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
Comments (0)