অনলাইনে বিষ বিক্রি করে আত্মহত্যায় সহায়তা করতেন কেনেথ ল

May 30, 2026 - 20:00
0
অনলাইনে বিষ বিক্রি করে আত্মহত্যায় সহায়তা করতেন কেনেথ ল

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনলাইনের মাধ্যমে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রি করে আত্মহত্যায় সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত কানাডার এক ব্যক্তি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এই মামলায় তাঁর স্বীকারোক্তি নতুন করে অনলাইন নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিপজ্জনক পণ্যের অবাধ বিক্রি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম কেনেথ ল। বয়স ৬০ বছর। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের একটি আদালতে তিনি আত্মহত্যায় সহায়তার ১৪টি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কৌঁসুলিদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে এই স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা আরও গুরুতর কিছু অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক এই শেফ ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ফোরামের মাধ্যমে আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের কাছে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ সরবরাহ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রায় এক হাজার ২০০টি বিষাক্ত রাসায়নিকের প্যাকেট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছেন। এসব চালান ৪০টিরও বেশি দেশে পৌঁছেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে, অনলাইনে পরিচালিত একাধিক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করা হতো। শুধু রাসায়নিক বিক্রিই নয়, সেগুলো ব্যবহারের বিষয়ে তথ্য ও নির্দেশনাও দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে মামলাটি সাধারণ অবৈধ বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তের বিষয় হয়ে ওঠে।

যেসব অভিযোগে কেনেথ ল দোষ স্বীকার করেছেন, সেগুলোর সব ভুক্তভোগী কানাডার নাগরিক। তবে তাঁর কার্যক্রমের প্রভাব কেবল কানাডার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন দেশের তদন্তকারী সংস্থাগুলো দাবি করেছে, তাঁর সরবরাহ করা পণ্য ব্যবহার করে বহু মানুষ আত্মহত্যা করেছে অথবা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এই ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে কয়েক ডজন পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের স্বজনদের মৃত্যুর সঙ্গে কেনেথ ল-এর সরবরাহ করা রাসায়নিকের সম্পর্ক ছিল। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো প্রশ্ন তুলেছে, এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁর বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত অভিযোগ আনা হয়নি।

এই মামলার অন্যতম আলোচিত ভুক্তভোগী ছিলেন কানাডার তরুণ অ্যাশটিন প্রোসার ব্লেক। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির পর তাঁর মানসিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। একসময় তিনি উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে বাড়িতে ফিরে আসেন এবং ক্রমেই মানসিক সংকটে জড়িয়ে পড়েন।

অ্যাশটিনের মা কিম প্রোসার বলেন, সন্তানের মৃত্যু যে শূন্যতা তৈরি করেছে, কোনো বিচার বা শাস্তি তা পূরণ করতে পারবে না। তবে তিনি আশা করেন, এই মামলার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অন্য পরিবারগুলো এমন ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা পাবে।

২০২৩ সালের মে মাসে কেনেথ ল-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে অংশ নেয় প্রায় এক ডজন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং আরও কয়েকটি দেশের তদন্তকারীরা তথ্য বিনিময় ও যৌথ অনুসন্ধানে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁর নেটওয়ার্ক ও অনলাইন কার্যক্রমের ব্যাপক চিত্র সামনে আসে।

তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি তরুণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানসিক অবস্থায় থাকা মানুষের কাছে বিষাক্ত পদার্থ বিক্রি করছিলেন। অনুসন্ধানের সময় এক সাংবাদিক ক্রেতা পরিচয়ে যোগাযোগ করলে তিনি পণ্যের ব্যবহার সম্পর্কেও তথ্য দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধমূলক মামলাই নয়; এটি ডিজিটাল যুগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিপজ্জনক রাসায়নিক, ক্ষতিকর তথ্য এবং আত্মবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জোগানো বিভিন্ন উপকরণ সহজলভ্য হয়ে উঠছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা দ্রুত এসবের নাগাল পাচ্ছেন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সহানুভূতি, চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন অনলাইনে এমন নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যেখানে আত্মহত্যাকে সহজ করে তোলার উপকরণ ও তথ্য সরবরাহ করা হয়, তখন ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

কানাডার আইনে আত্মহত্যায় সহায়তার অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কেনেথ ল-এর বিরুদ্ধে দোষ স্বীকারের পর এখন তাঁর সাজা নির্ধারণের পালা। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কয়েক দিনব্যাপী ওই শুনানিতে ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই মামলার রায় এখন শুধু একটি ব্যক্তির শাস্তি নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং অনলাইনে বিপজ্জনক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

The post অনলাইনে বিষ বিক্রি করে আত্মহত্যায় সহায়তা করতেন কেনেথ ল appeared first on Citizens Voice.

Comments (0)

User