ইরানের ইউরেনিয়াম বিদেশে যাবে না, কড়া বার্তা সুপ্রিম লিডারের
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যেই নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। দেশটির নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত দুজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, সুপ্রিম লিডারের নির্দেশ অনুযায়ী তেহরানের কাছে থাকা সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম দেশেই সংরক্ষণ করা হবে। এই অবস্থান মূলত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিপরীতে ইরানের কৌশলগত বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি পারমাণবিক নীতির বিষয় নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই চাইছে, ইরানের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে অন্য কোনো দেশে স্থানান্তর করা হোক। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা কমে আসবে এবং অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনাও কিছুটা প্রশমিত হবে।
তবে তেহরান সেই প্রস্তাবে রাজি নয়। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের কৌশলগত সম্পদ বিদেশে পাঠানো হলে তা ভবিষ্যতে ইরানের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন কোনো চাপ বা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, এই পরিমাণ উপাদান ব্যবহার করে অন্তত এক ডজন পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন সম্ভব। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক প্রয়োজনের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমকে নিজেদের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এর আগেও ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত অপসারণ, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা বন্ধ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে না আনা পর্যন্ত তারা চাপ অব্যাহত রাখবে।
এমন পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনির নতুন নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, সেখানে ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
কূটনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের এই কঠোর অবস্থানের পর আলোচনার পথ কতটা খোলা থাকবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে নতুন কোনো সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বর্তমান অবস্থান থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, তেহরান এখন আর আগের মতো সহজে আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। বরং নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতাকে সামনে রেখেই ভবিষ্যৎ আলোচনা চালিয়ে যেতে চায় দেশটি।
Comments (0)